| বঙ্গাব্দ

খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬: দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের হাতছানি | বিডিএস বিশ্লেষণ

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 03-04-2026 ইং
  • 338923 বার পঠিত
খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬: দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের হাতছানি | বিডিএস বিশ্লেষণ
ছবির ক্যাপশন: খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬

খাল খনন কর্মসূচি: দ্বিতীয় ‘সবুজ বিপ্লব’ নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

বিশেষ বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ও পলিটিক্যাল এনালিস্ট)

ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের মানচিত্র মূলত নদী আর খালের এক জটিল জাল। এক সময় এই জলপথগুলোই ছিল দেশের অর্থনীতির ধমনী। বর্তমানে যখন উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০-২০ মিটার নিচে নেমে গেছে এবং কৃষিকাজ পুরোপুরি পাম্পনির্ভর হয়ে পড়েছে, তখন চার দশক আগের সেই ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’ পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ কি পারবে ১৯৭০-এর দশকের সেই জাদুকরী সাফল্য ফিরিয়ে আনতে?

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: জিয়াউর রহমানের ‘স্বনির্ভর’ দর্শন ও আজকের বাস্তবতা

বাংলাদেশের জন্মের পর ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশ যখন চরম খাদ্য সংকটে, তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮-৮১ সালে দেশব্যাপী এক বিশাল খাল খনন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন।

  • ইতিহাসের পাতায়: সেই সময় প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছিল। এর ফলে ১৯৮৫ সালের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন ১.২ কোটি টন থেকে বেড়ে ১.৫ কোটি টনে উন্নীত হয়। মজার বিষয় হলো, সেই সময় এটি কেবল সরকারি প্রকল্প ছিল না, বরং ‘স্বনির্ভর আন্দোলন’-এর অংশ হিসেবে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ কোদাল হাতে রাজপথে নেমেছিল।

  • ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট: চার দশক পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যখন পুনরায় এই কর্মসূচি শুরু করছেন, তখন পরিবেশগত প্রেক্ষাপট অনেক বেশি জটিল। ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং অসংখ্য নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে এখন কেবল ‘খাল খনন’ করলেই হবে না, উৎসমুখের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

২. কৃষি ও মৎস্য: প্রাকৃতিক ভারসাম্যে ফেরার লড়াই

বর্তমানে বাংলাদেশের সেচ ব্যবস্থার ৭৫% ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। এটি পরিবেশের জন্য একটি ‘টাইম বোমা’।

  • তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ১৯৮০-এর দশকে যখন খালগুলো সচল ছিল, তখন প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থার কারণে মাটির উর্বরতা বজায় থাকত এবং দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য ছিল। বর্তমানে বছরে ৪৭-৪৮ লাখ টন মাছ উৎপাদন হলেও তার বড় অংশই আসে খামার থেকে। খালগুলো পুনরুজ্জীবিত হলে আমরা আবার সেই ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারি, যেখানে প্রাকৃতিক উৎসের মাছের স্বাদ ও পুষ্টি হবে অবারিত।

৩. বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: মেগা প্রজেক্ট বনাম তৃণমূল সংস্কার

মিজানুর রহমানের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতি কিলোমিটার খাল খননে ১-৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এখানেই ইতিহাসের সাথে বর্তমানের বড় পার্থক্য দেখা দেয়।

  • দুর্নীতির ঝুঁকি: ১৯৭০-এর দশকে এই কর্মসূচি ছিল জনশ্রমনির্ভর, যেখানে দুর্নীতির সুযোগ ছিল কম। কিন্তু ২০২৬-এর আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টগুলোতে ২০-৩০% অর্থ অপচয়ের যে নজির রয়েছে, তা এই মহৎ উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

  • সমাধান: এখানে ‘ডিজিটাল মনিটরিং’ বা স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, যা সেই সময় সম্ভব ছিল না।

বিডিএস অ্যানালাইসিস: খাল খনন কর্মসূচি কেবল একটি খনন কাজ নয়, এটি বাংলাদেশের ‘জলজ সার্বভৌমত্ব’ পুনরুদ্ধারের লড়াই। ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগটি হবে ‘দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব’। তবে মনে রাখতে হবে, নদীর নাব্যতা না ফিরিয়ে খাল খনন করা মানে হলো ‘ফুসফুস ছাড়া রক্ত সঞ্চালনের’ চেষ্টা করা।


ভবিষ্যৎ রূপরেখা: এক নজরে করণীয়

পদক্ষেপঐতিহাসিক শিক্ষা২০২৬-এর কৌশল
দখল উচ্ছেদতখন খাল ছিল উন্মুক্ত।বর্তমানে প্রভাবশালী দখলদারদের হাত থেকে খাল উদ্ধার।
নদী-খাল সংযোগপ্রাকৃতিকভাবে পানি প্রবাহিত হতো।পলি অপসারণ ও নদীর ড্রেজিং নিশ্চিত করা।
জনগণের অংশগ্রহণস্বেচ্ছাশ্রম ছিল মূল ভিত্তি।স্থানীয় তদারকি কমিটি ও স্বচ্ছ বাজেট ব্যবস্থাপনা।
বন্যা নিয়ন্ত্রণদ্রুত পানি নিষ্কাশন হতো।পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা ও ড্রেনেজ কানেক্টিভিটি।

উপসংহার: ইতিহাসের শিক্ষা ও আগামীর বাংলাদেশ

শহীদ জিয়াউর রহমানের সেই দূরদর্শী পদক্ষেপ যেমন দুর্ভিক্ষ থেকে দেশকে বাঁচিয়েছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসূচিও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে কৃষিকে বাঁচাতে পারে। তবে এটি যেন কেবল ‘ঠিকাদারি প্রকল্পে’ পরিণত না হয়। যদি স্বচ্ছতা বজায় থাকে, তবে আবারও বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে খালের পানি কুলকুল শব্দে বইবে, কৃষক হাসবে আর মাছের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency